প্রেসক্লাবের সদস্যপদ: দিল্লীকা লাড্ডু

জাতীয় প্রেসক্লাবের মেম্বারশীপ নিয়ে এখন চারদিকে সাজ সাজ রব। আমি অনেকদিন যাই না, কিন্তু শুনি ক্লাবে উৎসবমুখর পরিবেশ। তার কিছুটা ছোঁয়া পাই ফেসবুকে, ভার্চুয়াল জগতে। প্রেসক্লাবের মেম্বারশীপ অনেকটা দিল্লিকা লাড্ডুর মতো। না পাওয়া পর্যন্ত মনে হয়, এখনও পূর্ণাঙ্গ সাংবাদিক হওয়া হলো না। কিন্তু পাওয়ার পর কোনো কাজে লাগে না। অন্তত আমার ক্ষেত্রে কোনো কাজে লাগেনি। সদস্য হওয়ার আগে হাজার দিন গেলেও, হওয়ার পর প্রেসক্লাবে খুব বেশি যাওয়া হয়নি। জাতীয় প্রেসক্লাব পেশাদার সাংবাদিকদের প্রতিষ্ঠান, সামাজিক ক্লাব নয়। তাই প্রেসক্লাবের স্বচ্ছল সদস্যদের অনেকেই অন্য অনেক সামাজিক ক্লাবের সদস্য হয়েছেন। সন্ধ্যার পর অনেকেই অন্য ক্লাবে সময় কাটান।
প্রেসক্লাবের সদস্যপদ নিয়ে একসময় কুখ্যাত ‘ব্ল্যাকবল’ ছিল। তারপর একসময় ক্ষমতার সুযোগে একটি ফোরাম ঢালাও সদস্যপদ দিয়ে অমোচনীয় বৈষম্যের সৃষ্টি করে। সেই বৈষম্য ঘোচাতে রীতিমতো দখল করে নেয়া হয় প্রেসক্লাব। পেশাদার সাংবাদিকদের সদস্যপদ দেয়ার দাবিতে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন হয়েছে। সে আন্দোলনে আমি সদস্য হওয়ার আগেও ছিলাম, পরেও আছি।
নতুন কমিটি দায়িত্ব নেয়ার পর সদস্যপদ নিয়ে নতুন আশার সঞ্চার হয়। নতুন কমিটি গঠনতন্ত্র সংশোধন করে প্রেসক্লাবের সদস্য সংখ্যার লিমিট বাড়িয়ে ১৫০০ করে। তার মানে প্রেসক্লাবে প্লাস মাইনাস আরো ৫০০ সদস্য করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। গত সপ্তাহে আগেই আবেদন করে রেখেছিলেন এমন ১০১ জনকে সদস্যপদ দেয়া হয়। ১০১ জনকে সদস্য করার পর নতুন কমিটির কাছে আর ৪০০ জনকে সদস্য করার সুযোগ আছে। প্রেসক্লাবের সদস্য হওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন, এমন অনেকেও এবার দলে দলে আবেদন করেন। দুদিন আগে বাছাই কমিটি বাছাই করে ৮০০ জনের নামের তালিকা প্রকাশ করেছে। এই ৮০০ জনের তালিকাই সদস্যপ্রত্যাশীদের মধ্যে বিপুল প্রত্যাশা তৈরি করেছে। অনেকদিন মাঠে ময়দানে রিপোর্টিং করি না বলে গত সপ্তাহে সদস্য হওয়া ১০১ জন এবং বাছাইয়ে উতরে যাওয়া ৮০০ জনের অনেককেই আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। তবে আমি বিশ্বাস করি, এরা সবাই পেশাদার সাংবাদিক।
তবে অনেক ব্যক্তির নামের পাশে থাকা প্রতিষ্ঠানও যখন অচেনা, তখন নিজের অজ্ঞতায় নিজেই বোকা হয়ে যাই। বাছাই কমিটি প্রকাশিত তালিকা নিয়ে খুব বেশি অসন্তোষ নেই। যারা এতদিন আন্দোলন করে আসছিলেন, তাদের প্রায় সবার নামই আছে তালিকায়। তাই আন্দোলনকারীদের মধ্যে একধরনের বিজয়ী ভাব দেখা যাচ্ছে। যেহেতু এই আন্দোলনের প্রতি নৈতিক সমর্থন ছিল, তাই আমার মধ্যেও একধরনের বিজয়ের অনুভূতি হয়েছে। খুব বেশি না হলেও অসন্তোষ একেবারে নেই, তা বলা যাবে না। কারণ যত জন আবেদন করেছিলেন, তাদের সবার নাম তো তালিকায় নেই, থাকা সম্ভবও নয়। তাই কিছু অসন্তোষ আছেই। পেশাদার সাংবাদিক সবাই প্রেসক্লাবের সদস্য হওয়ার যোগ্য। বাছাই কমিটির তালিকায় অনেকের নাম একাধিকবার আছে, শুনেছি আগে সদস্য এমন কারো কারো নামও নাকি আছে তালিকায়, কোনো এক পত্রিকার সাভার প্রতিনিধির নামও নাকি আছে, অনেকের নাম আর প্রতিষ্ঠানের নাম উল্টাপাল্টা হয়ে গেছে। তবে এসব অভিযোগের ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। আমি বরং এগুলোকে ‘ক্ল্যারিকেল মিসটেক’ হিসেবে বিবেচনা করছি। তবে আমার আশঙ্কা অন্য জায়গায়। যে ৮০০ জনের নামের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, এদের প্রায় সবাই নিজেদের প্রেসক্লাবের সদস্য ভাবতে শুরু করেছেন। কিন্তু আমার ধারণা এদের মধ্য থেকে ২০০এর বেশি সদস্য করা সম্ভব হবে না। কারণ নিশ্চয়ই প্রেসক্লাবের কমিটি ২০০ সদস্য করার সুযোগ নিজেদের হাতে রাখবে। শিগগিরই যখন, বাছাই তালিকা থেকে ২০০ জনকে সদস্য করে চূড়ান্ত তালিকা টানানো হবে। তখন বাছাইয়ে থাকা কিন্তু চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়ে যাওয়া ৬০০ জনের প্রতিক্রিয়া বা অনুভূতি কী হবে, সেটা নিয়েই আমি চিন্তিত।
আগেই বলেছি, পেশাদার সাংবাদিকদের সবারই জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য হওয়ার অধিকার এবং যোগ্যতা আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো সবাইকে প্রেসক্লাবের সদস্য করা সম্ভব নয়। কিন্তু কোন যোগ্যতায় প্রেসক্লাবের সদস্য হওয়া যায়, আর কোন অযোগ্যতায় বাদ পড়ে, তা এক চির রহস্য। এই যেমন এবারের বাছাইয়ে ৮০০ জনের নাম দেখে আমি নিজে লজ্জা পেয়েছি। তালিকায় এমন অনেক সিনিয়র সাংবাদিকের নাম আছে, তারা এতদিন যে প্রেসক্লাবের সদস্য ছিলেন না, আমি সে প্রেসক্লাবের সদস্য ছিলাম, এটা আসলে লজ্জারই। এমন লজ্জার অনেক ইতিহাস আছে। আমি যে প্রেসক্লাবের সদস্য, সে ক্লাবের সদস্য হতে পারেননি শামসুর রাহমান। আমি যে প্রেসক্লাবের সদস্য সে ক্লাবের সদস্য ছিল যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামান। জাতীয় প্রেসক্লাবকে ধন্যবাদ তারা আমাদের সেই গ্লানি মোচনের উদ্যোগ নিয়েছেন। তারা চেষ্টা করছেন দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বৈষম্য দূর করার।
এতকিছুর পরও কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রেসক্লাবের অবস্থা আসলে ভারতীয় হাইকমিশনের মতো। তারা যেমন কেনো ভিসা দেয়া হলো না, তা জানায় না, তেমনি প্রেসক্লাবও জানায় না, কেন কাউকে বাদ দেয়া হলো। যেমন আমার সহকর্মী শহিদুল আজম। ২৭ বছর ধরে সাংবাদিকতা করছেন তিনি। কাজ করেছেন বিভিন্ন নামী প্রতিষ্ঠানে, পালন করেছেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ২০০৫ সালেই তার আবেদনটি বাছাই কমিটি পুলসেরাত পার হয়েছে। কিন্তু গন্তব্যে পৌছাতে পারেনি। আজম আশা করছিলেন, এবার তার নাম থাকবে। কিন্তু ১০১ জনের তালিকায় তো নেইই, নেই ৮০০ জনের তালিকায়ও। বয়সে-পদবীতে তারচেয়ে অনেক জুনিয়র অনেকের নামও আছে তালিকায়। এমনকি এবার বাছাইয়ে যে ৮০০ জনের নাম আছে, তাতে আছে এটিএন নিউজের ৮ জনের নামও। এই ৮ জনের মধ্যে ৭ জনই আজমের জুনিয়র। আজম অনেক চেষ্টা করছেন, তার অযোগ্যতা জানার, পারেননি। আমার পাশের চেয়ারের সহকর্মী বলে শহীদুল আজমের দুঃখটা আমি জানি। লিটন হায়দার বিডিনিউজ২৪.কম এর সিনিয়র সাংবাদিক। তিনিও দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতা করছেন। তিনিও এবার আবেদন করেছিলেন। কিন্তু কোনো তালিকাতেই ঠাই পায়নি তার নাম। ক্ষোভে তিনি সদস্য হওয়ার আবেদন প্রত্যাহার করতে আবেদন করেছেন প্রেসক্লাবের সভাপতি বরাবর। সবার কথা আমি জানি না, কিন্তু আমি নিশ্চিত এমন বঞ্চনার দুঃখ সইতে হচ্ছে আরো অনেককেই।
প্রেসক্লাবের সদস্যপদ দেয়ার একটা আনঅফিসিয়াল প্রক্রিয়ার কথা জানি। বাছাই করা তালিকা নিয়ে কমিটি বসে। তাতে দুই ফোরাম থেকে তাদের পছন্দের তালিকা দেয়া হয়। অপর ফোরামের কেউ আপত্তি না করলে, তা চূড়ান্ত তালিকায় ঠাঁই পায়। নেতারা নাম দেয়ার ক্ষেত্রে ফোরামের প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্যটাই শুধু বিবেচনায় নেন। কারণ এখানে ভবিষ্যত নির্বাচন, ভোট ইত্যাদির অনেক হিসাব নিকাশ আছে। তাই কেউ ঝুঁকি নিতে চান না। তার মানে আপনার দলীয় পরিচয় যত বেশি, সদস্যপদ পাওয়ার সম্ভাবনাও তত বেশি। যত নিরপেক্ষ, ঝুঁকি তত বেশি। আপনি নিরপেক্ষ হলে কোনো ফোরামই আপনার নাম দেবে না।
আমি তো লিখেই খালাস। কিন্তু আমি জানি, বাছাই কমিটির বা মূল কমিটির নেতাদের কী প্রচন্ড চাপ সইতে হচ্ছে প্রতিদিন। আমি নিজেও একাধিক নেতাকে ফোন করে তদ্বির করেছি, বিরক্ত করেছি। আমি জানি, প্রেসক্লাবের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত নই বলে আমি তত বিরক্ত করিনি। কিন্তু যারা সক্রিয়, তারা তাদের পছন্দের লোকদের নাম তালিকায় তুলতে নিশ্চয়ই নেতাদের কান ঝালাপালা করে ফেলছেন। আর যারা নিজেরা প্রত্যাশী, তারা তো আছেনই। সবাই সাংবাদিক, সবাই সহকর্মী, কাউকেই মুখের ওপর না করা যায় না। তাদেরও তো ভবিষ্যতে নির্বাচন, ভোট ইত্যাদি বিবেচনা মাথায় রাখতে হয়। প্রেসক্লাবের নেতাদের জন্য আমার সত্যি মায়া লাগছে। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর বাদ পড়াদের প্রতিক্রিয়া তারা কিভাবে সামলাবেন, তা নিয়েও আমি শঙ্কিত।
তবুও যে ১০১ জন নতুন সদস্য হয়েছেন তাদের অভিনন্দন এবং যারা হতে যাচ্ছেন, তাদের জন্যও আগাম অভিনন্দন।
লেখক: সাংবাদিক ও সহকারি বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ,

সূত্র:priyo.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD