নারীর নের্তৃত্ব বিকাশে অগ্রগামী লিল্টু রানী

নারীর নের্তৃত্ব বিকাশে অগ্রগামী লিল্টু রানী

এম এ আছাদ, স্টাপ রিপোর্টারঃ

একজন নারী। সে একাধারে একজন কন্যা, বোন, স্ত্রী, ভাবী, ননদ, মা ইত্যাদি। নারী হচ্ছে এ গোলকধাঁধার পৃথিবীতে একজন সংগ্রামী অভিনেত্রী। এ জগৎ সংসারে তাকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে অভিনয় করতে হয়। সমাজে নারীরা যে এতটাই মূলহীন সেটা এ ধরাধামে তাকালেই বোঝা যায়। নারী হচ্ছে ভোগের পণ্য, সংসারে তাদের থাকেনা কোন মতামত প্রকাশ করার অধিকার, স্বাবলম্বী হওয়ার অধিকার, বিনোদন কিংবা স্বাধীন ভাবে চলা ফেরার বা নিজের বাড়ির অধিকার। পদে পদে নারীদেরকে বিভিন্ন ভাবে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। কিন্তু এর ফল কি? সমাজে একজন নারী ছাড়া একজন পুরুষ আদৌও চলা সম্ভব?
বর্তমানে এ অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজে নারীরা তাদের অধিকার ও নের্তৃত্ব বিকাশে অগ্রগামী ভূমিকা রেখে চলেছে। বর্তমানে নারীরা আর পিছিয়ে থাকতে চাইনা। সমাজ পরিবর্তনে তারা পুরুষের সাথে সমান তালে কাজ করে যাচ্ছে। একজন নারী বর্তমানে সে অর্থ উপার্জন ও গচ্ছিত রাখার সুযোগ পাচ্ছে, মত প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছে, সমাজের অসহায় ও নির্যাতিত নারীর পাশে দাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে, সামাজিক বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার সুযোগ পাচ্ছে, সমাজের নের্তৃত্ব পর্যায়ে কথা বলার ও অংশ গ্রহণ করতে পারছে। নারীরা যে সমাজের এতসব পরিবর্তন ঘটাতে পেরেছে তা একদিনের নয়। অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে তারা আজ সমাজের এ পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হচ্ছে।
এতক্ষণ যে সব সংগ্রামী নারীদের কথা বলা হচ্ছে তার মধ্যে খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার লিল্টু রানী। ১৯৮৭ সালের এক শুভ দিনে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনি ইউনিয়নের গোয়াল বাথান গ্রামে জন্ম গ্রহণ করে। তার বাবার নাম অশোক কুমার মন্ডোল মায়ের নাম পুর্নিমা রানী মন্ডল। দুই ভাইবোনের মধে সে সবার বড়ো। লিল্টুর বয়স যখন পাঁচ তখন তার বাবা তাকে পার্শ্ববর্তী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেন। শুরু হয় লিল্টুর স্কুল জীবন। এক সময় সে প্রাথমিকের গন্ডি পার হয়ে মাধ্যমিকে ভর্তি হয়। মনে মনে সে স্বপ্ন আঁকতে থাকে লেখাপড়া শেষ করে ভালো কোন চাকরি নিয়ে এলাকার জনগণের পাশে দাঁড়াব। সে লক্ষ্য নিয়েই সে সামনে অগ্রসর হতে থাকে। কিন্তু তার আঁকা স্বপ্নে বাঁধ সাধে নিয়তি। দশম শ্রেণিতে থাকাকালীন ২০০১ সালে তার পরিবার পার্শ্ববর্তী রাড়ুলী দক্ষিণ পাড়া গ্রামের শ্যামল কুমার মন্ডলের সাথে বিবাহ দেয় । লিল্টুর মাথায় যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত সৃষ্টি পায়। যে সময় মেয়েরা মুখে হাসি আর বুকে বই নিয়ে দুলতে দুলতে স্কুলে যায় সে সময় লিল্টুকে যেতে হয় স্বামীর ঘরে।
কিন্তু লিল্টু রানী জীবন যুদ্ধে হেরে যাওয়ার নয়। তাই তো সে তার কর্মগুণে এবং বুদ্ধিদীপ্ত আচরণে স্বামীর সংসারে থেকে তার সাথে পরামর্শ করে সাংসারিক কাজ সামলিয়ে আবারও লেখা পড়া শুরু করে। সে সাংসারিক কাজ ও লেখাপড়া করার পাশাপাশি এ কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজকে বদলে দিতে ব্র্যাক সামাজিক ক্ষমতায়ন কর্মসূচির আওতাধীন পল্লী সমাজ সহ সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনে যুক্ত হয়ে সমাজের মানুষের কল্যানে নিজেকে সামিল রেখেছে। তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে একটি হলো তার নের্তৃত্বে ৩৩০ফিট রাস্তা সংস্কার।
লিল্টু রানী পর থেকেই দেখতে পায় তার এলাকায় চলাচলের জন্য ৩৩০ ফিট রাস্তা প্রতি বছরই বৃষ্টি আসলে পুকুরের মধ্যে ভেঙে যায়। আবার প্রতি বছরই জোড়াতালি দিয়ে কোন রকমে চলাচলের উপযোগী করা হয়। কিন্তু এর শেষ কোথায়? সে ভাবতে থাকে কি ভাবে এ রাস্তার স্থায়ী সমাধান করা যায়। সে তখন তার এলাকার জনগণের সাথে বিভিন্ন ভাবে বুদ্ধি পরামর্শ করতে শুরু করে। এছাড়াও সে স্থানীয় নের্তৃবৃন্দের সাথে কথা বলে কোন সুরাহা না হওয়ায় সে পল্লী সমাজের নের্তৃবৃন্দ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে সাথে নিয়ে স্থানীয় এমপি আক্তারুজ্জামান বাবু-মহদয়েরর সাথে কথা বলে। এমপি মহদয় লিল্টুকে এ ধরনের কাজ হাতে নেয়ার জন্য ধন্যবাদ জানান এবং কিছু আর্থিক সহায়তা প্রদান সহ পরবর্তীতে আরও সহায়তা করার আশ্বাস দেন।
এরপরে লিল্টু রানী চিন্তা করেন শুধু সরকারি বা অন্যের সহায়তার জন্য বসে থাকলে কাজ উদ্ধার হবে না। তাইতো সে পল্লী সমাজ ও এলাকার লোকজনকে ডেকে একটি সভার আয়োজন করে। সেখানে সে সবাইকে রাস্তা সংস্কার সম্পর্কে বুঝাতে সক্ষম হয় এবং সিদ্ধান্ত নেয় সরকারি সহায়তার পাশাপাশি নিজেরাও কাজে নেমে দ্রুত রাস্তা সংস্কার করব। যেই বলা অমনি কাজ। লিল্টু রানী পল্লী সমাজের সদস্যবৃন্দ, কিশোর কিশোরী ও স্থানীয় জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে রাস্তা সংস্কারের কাজে নেমে পড়ে। মূলত লিল্টু রানীর কর্ম ও নের্তৃত্ব গুনেই জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের চলাচলের ৩৩০ফিট রাস্তা বর্তমানে নিজেরাই সংস্কার করে চলেছে।
বর্তমানে লিল্টু রানী পাইকগাছা ফসিয়ার রহমান কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছে। তার একছেলে ও এক মেয়ে। ছেলেটি এসএসসি পরীক্ষার্থী, মেয়েটি ৪র্থ শ্রেণিতে লেখাপড়া করতেছে লিল্টু রানী ব্র্যাক সামাজিক ক্ষমতায়ন কর্মসূচির আওতাধীন পল্লীসমাজের সভাপতি সহ রাড়ুলী ইউনিয়নের যুব মহিলা লীগের ওয়ার্ড সভাপতি, ভুমিজ ফাউন্ডেশন, পানি ও জীবন প্রকল্প, কৃষি অফিসের সিআইজি কমিটির সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করে চলেছে। তাছাড়া যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সাথে যোগাযোগ করে তার এলাকার ৩৫জন বেকার যুবক-যুবতিদের সেলাইয়ের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে বেকারত্ব দুর করেছে। এতসব সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৯ সালে পাইকগাছা উপজেলা প্রশাসন ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মাধ্যমে লিল্টু রানী শ্রেষ্ঠ জয়িতার পুরস্কার লাভ করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD